বিদ্রোহের নতুন পরিচয়: ‘আমরা ৯৯%’

‘আমরা ৯৯%’ এই পরিচয় নিয়ে এবং দখল করার ডাক দিয়ে নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থী-শিক্ষক, শ্রমিক, লেখক-শিল্পী, বেকার, দরিদ্র, নিম্নবিত্ত-মধ্যবিত্ত এবং সংবেদনশীল নিপীড়ন-বৈষম্য অন্যায়বিরোধী মানুষের বিক্ষোভ ক্রমেই দেশ থেকে দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। সমাবেশে উপস্থিতি শত ছাড়িয়ে হাজার, হাজার ছাড়িয়ে লাখ অতিক্রম করছে। ইতিমধ্যে বিশ্বের প্রায় এক হাজার শহরে এই বিক্ষোভ-সমাবেশ সম্প্রসারিত হয়েছে। কোথাও কোথাও পুলিশ বাধা দেওয়ায় তার সঙ্গে সংঘাত তৈরি হয়েছে। রক্তাক্ত হয়েছে নিরস্ত্র বিক্ষুব্ধ মানুষ। কয়েক দিন আগে বিক্ষোভকারীরা একটি ছোট্ট ভিডিওতে প্রকাশ করেছে, ওবামা ও হিলারি যখন সিরিয়া, লিবিয়া বা মিসরকে উপদেশ দিচ্ছেন মত প্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষায় দমন-পীড়ন বন্ধ করতে, যখন তরুণ প্রজন্মকে নতুন ইতিহাস নির্মাণে অভিনন্দন জানাচ্ছেন, তখন তাদেরই পুলিশ যুক্তরাষ্ট্রের শহরে শহরে নিরস্ত্র বিদ্রোহী তরুণদের ওপর বর্বর হামলা পরিচালনা করছে (http://front.moveon.org/the-most-powerful-occupywallstreet-clip-you-will...) | তরুণ বিক্ষোভকারীরা প্রত্যয়ী, তাদের সংখ্যা ও দৃঢ়তা বাড়ছেই।
কারা এই বিক্ষোভের লক্ষ্য? কারা এর প্রতিপক্ষ? আর কারা এই আন্দোলনের পক্ষে? এই আন্দোলনের গতিমুখ কোন দিকে? কেন এই দুটি স্লোগানের সঙ্গে সবাই নিজের আকাঙ্ক্ষা মেলাতে পারছে? ‘আমরা ৯৯%’ স্লোগানের মধ্য দিয়ে সর্বত্র শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষের জীবন ও স্বার্থের ঐক্য-সংহতি প্রকাশ করা হয়েছে। এটি আরও স্পষ্ট হয় যখন বিক্ষোভকারীরা বলে, ‘শতকরা ১ ভাগ আমাদের সম্পদ দখল করে রেখেছে।’ মাইকেল প্যারেন্টি বলছেন, ‘এটি সরাসরি শ্রেণীযুদ্ধের আওয়াজ।’ সেই এক ভাগের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ একচেটিয়া পুঁজির প্রতিনিধি বৃহৎ বহুজাতিক সংস্থা, ব্যাংক, বিমা এবং নানা অর্থকরী প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাদেরই কেন্দ্র নিউইয়র্কের বাণিজ্যিক এলাকা ওয়াল স্ট্রিট। এক পোস্টারে এর নাম দেওয়া হয়েছে, ওয়ার স্ট্রিট। কেননা, এদের স্বার্থেই যুক্তরাষ্ট্র দেশের পর দেশ দখল ও সন্ত্রাসে তার সর্বশক্তি নিয়োজিত রেখেছে গত ছয় দশক। আরেক পোস্টারে লেখা, ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট, নট আফগানিস্তান’।
এক পোস্টারে বলা আছে ‘ওয়াল স্টিট গ্রিড=হাংরি কিডস’। ১%-এর লোভের জন্যই সারা বিশ্বে অনাহার, দারিদ্র্য, অকালমৃত্যু—যাদের বড় অংশ শিশু। সারা বিশ্বের সর্বজনের সম্পদ উন্নয়নের নামে গ্রাস করেছে কতিপয় গোষ্ঠী কিংবা করপোরেশন। তাদের মুনাফার লোভ মেটাতে গিয়ে অনিশ্চয়তা, সন্ত্রাস, অপমানে জর্জরিত শতকরা ৯৯ ভাগ মানুষ।
যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ কেন অনাহারে এবং চিকিৎসার অভাবে বিপর্যস্ত হবে? কেন আশ্রয়হীন থাকবে? এটা অনেকের কাছে অবিশ্বাস্য মনে হওয়ার কথা। কেননা, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর, নিজ দেশ শুধু নয় সারা বিশ্বের বিশাল সম্পদ কতিপয় মার্কিন গোষ্ঠী আর তাদের শাগরেদদের দখলে। একটি ছোট ঘোষণা ভিডিওতে প্রথম কর্মসূচি ঘোষণা করা হয় ১৪ জুন (http://www.globalresearch.ca/index.php?context=va&aid=26864)। বলা হয় ‘ডেমোক্র্যাটরা ব্যর্থ, রিপাবলিকানরা ব্যর্থ। এখন আমাদের স্বার্থ আমাদেরই দেখতে হবে, তোমার স্বার্থ তোমাকেই দেখতে হবে।’ আরও বলা হচ্ছে, ‘যারা পরিকল্পিতভাবে আমাদের সম্পদ লুট করে নিজেদের সম্পদের পাহাড় গড়েছে তাদের মুখোমুখি দাঁড়াতে হবে। ‘আমরা ৯৯%।’ কর্মসূচির নাম দেওয়া হয়েছে, ‘অপারেশন এম্পায়ার স্টেট’।
যুক্তরাষ্ট্রের কেন এই হাল? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থার কেন্দ্র ইউরোপ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরে যায়। তার পর থেকে আধিপত্য বিস্তার এবং তেল কোম্পানি, অস্ত্র কোম্পানিসহ বৃহৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ, সহিংসতা, সামরিক শাসন, গণহত্যা বিস্তৃত করেছে। নোয়াম চমস্কি, জোসেফ স্টিগলিজ, নাওমি ক্লেইন, উইলিয়াম ব্লুমসহ অনেকেই তথ্য-উপাত্ত দলিল দিয়ে দেখিয়েছেন কীভাবে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে উঠেছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় সন্ত্রাসী শক্তি। কোনো দেশ পারমাণবিক গবেষণা করলে যুক্তরাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে নানা প্রতিরোধ তৈরি করে কিন্তু নিজের পারমাণবিক স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্যই তাকে প্রতিবছর খরচ করতে হয় বিশাল অর্থ।
এক হিসাবে দেখা গেছে, শুধু এই কাজে যুক্তরাষ্ট্রের যে অর্থ ব্যয় হয় তা যদি এক ডলারের নোট দিয়ে দড়ি বানানো হয় তাহলে তার দৈর্ঘ্য এমন হবে যে, সেই দড়ি দিয়ে চাঁদে গিয়ে ফেরত আসা যাবে। যখন যুক্তরাষ্ট্রে কখনো না কখনো অনাহারে থাকেন এমন মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৪ কোটি, বেকার শতকরা প্রায় ১৩ ভাগ, যখন শিক্ষা-চিকিৎসার অর্থ পাওয়া যাচ্ছে না, তখন যুদ্ধ, গোয়েন্দাগিরি, চক্রান্ত ইত্যাদি কাজে এই একই রাষ্ট্রের বার্ষিক খরচ এক হাজার বিলিয়ন ডলার বা এক ট্রিলিয়ন ডলার। অনাহারী মানুষের খাদ্য জোগানের খরচ মাত্র ১০ বিলিয়ন ডলার!
কৃত্রিম জৌলুশ, বিশ্বব্যাপী দখল সন্ত্রাস ও একচেটিয়া পুঁজিকে সম্পদ জোগাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন সবচেয়ে ঋণগ্রস্ত দেশ। বার্ষিক জাতীয় আয়ের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে তার ঋণ। রাষ্ট্র, পরিবার এবং ব্যক্তি—সবই এখন ঋণে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। রাষ্ট্রীয় ঋণের সীমা যখন অতিক্রম করতে যাচ্ছে, তখন গত মাসে, কংগ্রেসে ঋণসীমা বৃদ্ধির অনুমতি নিয়েছে ওবামা সরকার। গৃহঋণ ধস থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে পরিবারের পর্যায়ে আয়ের তুলনায় ঋণ এত বেশি যে তা শোধ করার সীমা তারা পার হয়ে গেছে অনেক আগেই। এই জায়গায় এসে ফুলে ফেঁপে ওঠা ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও ধসে পড়ে। আবার বেইলআউটের নামে জনগণের করের টাকায় ট্রিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয় তাদের উদ্ধারের জন্য। যাদের জন্য মানুষ ও অর্থনীতির দৈন্য তাদের শাস্তি না দিয়ে, হাতে আরও টাকা তুলে দেওয়া হয় ‘চুইয়ে পড়া তত্ত্ব’ অনুযায়ী; যে তত্ত্ব বলে ধনীদের হাতে যত টাকা যাবে তত তারা বিনিয়োগ করবে, তত কর্মসংস্থান বাড়বে। বাড়েনি, বেকারত্ব বেড়েছে। কারণ, সম্পদ কেন্দ্রীভূত যাদের হাতে, অধিক মুনাফার জন্য তারা এমন বিনিয়োগে আগ্রহী যাতে উৎপাদনশীল তৎপরতা বরং ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের কাজ আয় এমনকি খাদ্য যখন অনিশ্চিত তখন বড় বড় করপোরেশনের, যাদের জালিয়াতির জন্য অর্থনীতির ধস, কর্মকর্তারা বেইলআউটের টাকায় আয় করেছে কোটি ডলার বোনাস, বেতন।
এই ছবি শুধু যুক্তরাষ্ট্রের নয়, সারা বিশ্বের অধিকাংশ দেশের। যুক্তরাষ্ট্র যাদের সম্পদ দিয়ে একটা কৃত্রিম সচ্ছলতার ঘোর তৈরি করে মার্কিনদের বহুদিন বুঁদ করে রাখতে পেরেছিল, সেই সব প্রান্তস্থ দেশে লড়াই বহুভাবে বহুদিন ধরেই চলছে। সেই লড়াই দমনে বুদ্ধিবৃত্তিক ও সামরিক জোগানদার ছিল যুক্তরাষ্ট্রই। এখন কেন্দ্র প্রত্যক্ষ করছে বিদ্রোহ। এখন শোষণ-নিপীড়নের বিশ্বায়নের মোকাবিলা করতে জোরদার হচ্ছে প্রতিরোধের বিশ্বায়নের ঐতিহাসিক পর্ব।
আন্দোলনের সক্রিয় অংশীদার আমেরিকান ওয়ার্কার্স কোঅপারেটিভের প্রেসিডেন্ট বন্ধু ডিজার হর্ন ১৮ অক্টোবর ই-মেইলে সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে আমাকে জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘১০ বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে কেউ পুঁজিবাদ শব্দটি উচ্চারণ করলেই তাঁকে কমিউনিস্ট গালি খেতে হতো। এখন পুঁজিবাদের ব্যর্থতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সর্বত্র। যেসব জায়গায় বিক্ষোভকারীরা অবস্থান নিয়েছে, সেখানেই শিক্ষার নতুন পর্ব বিকশিত হচ্ছে। শিকাগোতে হচ্ছে বহু পাঠচক্র, লিখিত হচ্ছে নাটক, গান। দেখা গেল শ পাঁচেক তরুণ বসে কমিউনিস্ট মেনিফেস্টো নিয়ে আলোচনা করছেন। নিউইয়র্কে জুকত্তি পার্কে নিপীড়িতের থিয়েটার, অর্থশাস্ত্র, নতুন অর্থনীতি, দর্শন নিয়ে একের পর এক বৈঠক হচ্ছে। যৌথ জীবন, সামষ্টিক স্বার্থ, ভবিষ্যতের নতুন মানবিক জীবন নিয়ে আলোচনা চর্চা লড়াইকে ভাষা দিচ্ছে, সামনে তাকানোর শক্তি জোগাচ্ছে। এটা ঠিক যে একক কোনো নেতৃত্ব নেই এই আন্দোলনে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের শহরগুলোতে দীর্ঘদিন যেসব ইউনিয়ন বা সংগঠন গড়ে উঠেছে, তারাই মুখ্য ভূমিকা পালন করছে প্রচার ও যোগাযোগে। এত দিন ভিন্ন ভিন্ন ভাবে কাজ হতো এখন তৈরি হচ্ছে একক লক্ষ্য ও ঐক্যসূত্র। আগামী বছরে শিকাগোতে যে জি-৮ সম্মেলন হতে যাচ্ছে, সেটা নিশ্চিতভাবেই এক বড় লড়াইয়ের ক্ষেত্র হবে।’
তিনি আরও বলছেন, ‘এই আন্দোলনের সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো, যাঁরা আন্দোলনের কর্মী নন, যাঁরা সংগঠক নন, যাঁরা বামপন্থী নন, এটি তাঁদের হূদয়কেও টান দিয়েছে।...আমাদের সংখ্যা বিস্তৃত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ এখন বিশ্বের মানুুষকে জানাচ্ছে যে তারা আর ঘুমিয়ে নেই। আমরা বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের মুক্তির লড়াইয়ের সঙ্গে সংহতি নিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছি।’
‘আমরা ৯৯%’ এখন সারা বিশ্বের নতুন লড়াইয়ের স্লোগান হতে চলেছে। দখল বলে যে স্লোগান তা আসলে শতকরা ১ ভাগের হাত থেকে দেশ ও ক্ষমতার কেন্দ্র দখলমুক্ত করা। একটি অভিন্ন প্রতিপক্ষ, অভিন্ন বৈশ্বিক লক্ষ্য। আমাদের জন্য এই লড়াই নতুন নয়, দেশ ও সম্পদের ওপর জনগণের শতভাগ মালিকানা ও কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার লড়াই তো বাংলাদেশের মানুষ করছেই। এই দুই স্লোগান সারা বিশ্বের, আমাদের।

বারবার তেল গ্যাস বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি থেকে বের হওয়ার পথ কী?

সরকার তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম একের পর এক বৃদ্ধি করছে। বাজেট প্রক্রিয়ার বাইরে, বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে এরকম উপর্যুপরি দাম বৃদ্ধি পুরো বাজেট প্রক্রিয়াকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে। তদুপরি এসব দাম বৃদ্ধির প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াও সরকার যথাযথভাবে অনুসরণ করছে না। এসব দাম বৃদ্ধির কারণে অর্থনীতি ও জনগণের ওপর যে বোঝা তৈরি হচ্ছে, তা টেনে নেয়া একক পরিবার ও দেশ কারও পক্ষেই সম্ভব নয়।
প্রতিবারই যুক্তি দেয়া হচ্ছে ভর্তুকির কথা, লোকসানের কথা। কিন্তু এই ভর্তুকি আর লোকসানের কারণ নিয়ে সরকারের কোন ব্যাখ্যা নেই, তা সমাধানেরও কোন চেষ্টা নেই। উল্টো এখনও গ্যাস ও বিদ্যুৎ খাতে যেসব উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে তাতে সামনে ভর্তুকি, লোকসান আরও বৃদ্ধির পথই প্রশস্ত হচ্ছে।
এসব উদ্যোগের মধ্যে বিদেশী কোম্পানির সঙ্গে গ্যাস রফতানিমুখী চুক্তি, তৃতীয় পক্ষের কাছে গ্যাস বিক্রির অনুমতি দিয়ে চুক্তি, রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ প্লান্ট নবায়ন ও মেরামতের সহজ কাজ না করে উচ্চ দামে বিদ্যুৎ ক্রয়ের জন্য রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্লান্ট স্থাপনের চুক্তি, নতুন আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার পাঁয়তারা ইত্যাদি অন্যতম। সংক্ষেপে এ বিষয়গুলোই এখানে আমি উপস্থাপন করতে চাই।
২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১০ তারিখে জ্বালানি মন্ত্রণালয় কেয়ার্ন এনার্জি ও হেলিবার্টনের সঙ্গে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। তৃতীয় পক্ষের কাছে এই কোম্পানিগুলোকে স্বাধীনভাবে গ্যাস বিক্রির অনুমতি প্রদান করার জন্যই এ চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে। এই চুক্তি দেশের জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে আরেকটি আÍঘাতী সিদ্ধান্ত। কারণ
এক. এর ফলে গ্যাসের দাম বেড়ে যাবে। গ্যাসের দাম বাড়লে অন্যান্য পণ্যেরও দাম বেড়ে যাবে।
দুই. একবার এই চুক্তি সম্পাদন হলে আগামীতে উৎপাদন বণ্টন চুক্তি সংশোধন/লংঘনের এই ধারা অনুসরণ করতে চাইবে অন্য বহুজাতিক গ্যাস কোম্পানিগুলো।
তিন. গ্যাসসম্পদের পর এবার গ্যাসভিত্তিক অর্থনীতির ওপর পূর্ণ কর্তৃত্ব লাভ করবে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো। ফলে দেশের গ্যাস দিয়ে দেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে গ্যাসের চাহিদা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পূরণ করার ক্ষমতা রাষ্ট্র হারাবে।
চার. এর ফলে দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ খাত আরও বড় প্রতিকূলতার সম্মুখীন হবে।
এরপর ১৬ জুন, ২০১১ শতকরা ৮০ ভাগ কোম্পানির মালিকানা ও শতভাগ গ্যাস রফতানির বিধান রেখে মার্কিন কোম্পানি কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করে সরকার। উল্লেখ্য, স্থলভাগে ও অগভীর সমুদ্রে পিএসসি স্বাক্ষরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের রয়েছে। ১৯৯৩-৯৪ থেকে শুরু করে সম্পাদিত চুক্তিগুলোর ফলাফল এখন আমাদের সামনে পরিষ্কার। পুঁজি ও সক্ষমতার অভাবের কথা বলে বিদেশী কোম্পানির হাতে একের পর এক গ্যাসব্লক তুলে দেয়া হয়েছে। কিন্তু যে পরিমাণ পুঁজি হলে জাতীয় সংস্থা এক-দশমাংশ দামে গ্যাস সরবরাহ করতে পারত সেই পুঁজির সংস্থান করা হয়নি; কিন্তু তার দশগুণ বেশি পাচার হয়েছে। সেই অর্থ এখন প্রতি বছর ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। প্রযুক্তির অভাবের কথা বলে বিদেশী কোম্পানির হাতে গ্যাসব্লক তুলে দেয়া হলেও তাদের কারণে মাগুরছড়া ও টেংরাটিলা ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে, আমাদের প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস নষ্ট হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে গ্যাসের দাম ক্রমান্বয়ে বাড়ছে, সেখান থেকে এই পরিমাণ গ্যাস কিনতে এখন ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। ন্যূনতম এ পরিমাণ টাকা শেভরন ও নাইকোর কাছে আমাদের পাওনা, যা আদায়ে কোন উদ্যোগ এ যাবৎ কোন সরকার নেয়নি।
তেল আমদানির ওপর বাংলাদেশের কঠিন নির্ভরশীলতার কথা আমরা সবাই জানি। গ্যাস না থাকলে এ নির্ভরশীলতা আরও বহুগুণ বেশি থাকত। এ প্রসঙ্গে আমাদের স্মরণ করতে হবে, উল্লিখিত চুক্তিগুলোর কারণেই বছর দশেক আগে গ্যাস রফতানির প্রবল চাপ তৈরি হয়েছিল। ‘বাংলাদেশ গ্যাসের উপর ভাসছে’ এই প্রচারণা চালিয়ে গ্যাস রফতানির আয়োজন করেছিল দেশী-বিদেশী যে মহল তাদের রাহুগ্রাস থেকে বাংলাদেশ এখনও মুক্ত হয়নি। জনগণের প্রতিরোধের কারণে সে সময় তারা সফল হয়নি, হলে তেল আমদানিতে আরও ২০ হাজার কোটি টাকা বেশি ব্যয় করতে হতো। তেলের বিশ্ববাজারে চরম অনিশ্চয়তার কারণেই তাই আমাদের নিজস্ব জ্বালানি সম্পদের ওপর শতভাগ জাতীয় মালিকানা নিশ্চিত ও তার রফতানি নিষিদ্ধ করা অপরিহার্য। সে সময় রফতানি ঠেকানো গেলেও চুক্তি এখনও আছে, সেজন্য বহুগুণ বেশি দামে কিনতে হচ্ছে আমাদেরই গ্যাস। বিদেশী কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে বেশি দামে গ্যাস কেনার কারণে ভর্তুকি বাড়ছেই। এসব চুক্তির কারণে বহুগুণ বেশি দামে গ্যাস কেনায় গত কয়েক বছরে ১৪ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হয়েছে। ভর্তুকির টাকা জোগান দেয়ার জন্য জাতির ওপর ঋণের বোঝা বাড়ছে, বাড়ছে করের বোঝা। অন্যদিকে ভর্তুকির চাপ কমানোর জন্য বারবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। এর কারণে উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে সব দ্রব্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি তৈরি হচ্ছে। মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। নতুন করে দারিদ্র্য বাড়ছে। শিল্প ও কৃষি উৎপাদনে ব্যয়বৃদ্ধিসহ অর্থনৈতিক উন্নয়নে নানা প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। প্রয়োজনের সময় গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না। শিল্প, কারখানা, কৃষিÑ সবকিছুতে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির মাধ্যমে পুরো অর্থনীতি বিপর্যস্ত হচ্ছে। কমিশনভোগী দুর্নীতিবাজদের সর্বক্ষেত্রে দাপট বাংলাদেশকে ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে
নিয়ে যাচ্ছে।
পুঁজির অভাবের কথা বলে কনোকো ফিলিপসের সঙ্গে চুক্তি করা হল অথচ কনোকো ফিলিপস আগামী ৫ বছরে যে বিনিয়োগ করবে তার পরিমাণ মাত্র ১১০ মিলিয়ন ডলার বা বছরে গড়ে ২২ মিলিয়ন ডলার। বর্তমান বিনিময় হার অনুযায়ী এর পরিমাণ ১৬৫ কোটি টাকা প্রতি বছর। সরকার এক বছরের বিলাসিতা, নতুন গাড়ি কেনার বরাদ্দ বাতিল করলেই এ টাকা পাওয়া সম্ভব। বাংলাদেশের অর্থনীতির বর্তমান অবস্থায় এ পরিমাণ অর্থ প্রয়োজনের নিরিখে অতিশয় তুচ্ছ। উপরন্তু দক্ষতা-প্রযুক্তির অভাবের যুক্তিও দেয়া হয়। কিন্তু কনোকো ফিলিপস বর্তমানে বিশ্বের ১৪টি স্থানে সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান করছে, যেখানে রিগ ভাড়াসহ নানা কাজে নানা প্রতিষ্ঠানকে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে কাজ চলছে। বঙ্গোপসাগরেও তারা তাই করবে। এই একই কাজ বাংলাদেশ নিজের মালিকানা রেখে করতে পারত।
জাতীয় সংস্থার কর্তৃত্বে প্রয়োজনে সাবকন্ট্রাক্ট দিয়ে এ গ্যাস অনুসন্ধানে নিয়োজিত হলে যে পার্থক্যটি দেখা দিত তা বিশাল : ১. গ্যাসসহ সব সম্পদের পূর্ণ তথ্য জনগণের কাছে থাকত এবং তার ওপর শতভাগ মালিকানা নিশ্চিত হতো। ২. দেশের অর্থনীতির প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত হতো। ৩. অনেক কম দামে গ্যাস প্রাপ্তি অর্থাৎ শিল্প, কৃষিতে সুলভে গ্যাসের ব্যবহার নিশ্চিত হতো। ৪. রফতানির ঝুঁকি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা যেত। ৫. মুনাফার তাড়নায় যেসব দুর্ঘটনা ঘটাচ্ছে কনোকো ফিলিপস সেসবের ঝুঁকি অনেক কমে যেত। ৬. বঙ্গোপসাগরের বিশাল এলাকায় জাতীয় কর্তৃত্বের ওপর হুমকি সৃষ্টি হতো না। অর্থাৎ ৭. জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো। এবং ৮. একের পর এক দাম বৃদ্ধির মাধ্যমে মানুষের জীবন দুর্বিষহ হতো না।
গত বছর সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলা দুটির সীমানা ধরে বিরাট গ্যাস মজুদ ধারণক্ষম একটি ভূতাত্ত্বিক কাঠামো চিহ্নিত করেছে বাপেক্স। দুই জেলার নামের অংশ নিয়ে এ গ্যাসক্ষেত্রের নাম দেয়া হয়েছে ‘সুনেত্র’। ধারণা করা হচ্ছে, এখানে প্রায় ৪-৫ টিসিএফ বা সারাদেশের বর্তমান মজুদের অতিরিক্ত শতকরা প্রায় ৪০ ভাগ মজুদ আছে। সুনেত্র গ্যাস ক্ষেত্র আবিষ্কার করার পর ২০১০ সালেই বাপেক্স সুনেত্র গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়ন করার জন্য ঝঁহধসমড়হল-ঘবঃৎধশড়হধ (ঝঁহবঃৎধ) ঙরষ/ধেং ঊীঢ়ষড়ৎধঃড়ৎু ডবষষ উৎরষষরহম চৎড়লবপঃ নামে তিন বছরের একটি পরিকল্পনা জমা দেয়। এ প্রস্তাবনা অনুযায়ী ২০১০ সালের জুন থেকে জুন ২০১৪ পর্যন্ত এ কাজ শেষ করতে ব্যয় হবে মাত্র ২৭৯ কোটি টাকা। এই একই কাজ সিলেটের বিবিয়ানায় করতে গিয়ে মার্কিন কোম্পানি শেভরন ব্যয় দেখিয়েছে প্রায় ২০০০ কোটি টাকা, আর তা তুলে নিয়েছে বাংলাদেশের কাছ থেকে। অথচ বাপেক্সের প্রকল্প এখনও পুঁজির অভাবের অজুহাত দিয়ে পুরোপুরি অনুমোদন দেয়া হয়নি। এই বিশাল গ্যাসক্ষেত্র পিএসসি বা জয়েন্ট ভেঞ্চার বা পিপিপির মাধ্যমে বিদেশী কোম্পানির হাতে তুলে দেয়ার চক্রান্ত চলছে, ‘পিএসসি ২০১১’ করার প্রক্রিয়া চলছে।
স্থলভাগে গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বাংলাদেশের জাতীয় সংস্থাগুলো ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে। বাংলাদেশের গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রতিষ্ঠান এবং দক্ষ ও অভিজ্ঞ জনশক্তি গড়ে উঠেছে। কিছুদিন আগেই বাপেক্সের একটি তরুণ বিশেষজ্ঞ দল রশিদপুরে আন্তর্জাতিক মানের থ্রিডি সিসমিক সার্ভের কাজ সাফল্যের সঙ্গে সম্পন্ন করেছে, সেখানেও একটি বড় গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে। আবারও প্রমাণিত হয়েছে, সুযোগ ও আর্থিক বরাদ্দের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি না করলে জাতীয় সক্ষমতা আরও বিকশিত হতো এবং বাপেক্স ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া ইত্যাদি দেশের সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা অর্জন করত। বহুদিন থেকেই বাপেক্স বা জাতীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা এবং তাদের পরিশ্রমলব্ধ তথ্যাদি বিদেশী কোম্পানির স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে জাতীয় প্রতিষ্ঠানকে আটকে রেখে, তার কাজের চাপকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে সম্পদ তুলে দেয়ার ইচ্ছা বিদেশী কোম্পানির হাতে। সাবকন্ট্রাক্টর হিসেবে নয়, স্বাধীন জাতীয় সংস্থা হিসেবেই বাপেক্সকে বিকশিত করতে হবে।
সুনেত্র রশিদপুর গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে অবিলম্বে গ্যাস উত্তোলনের কাজ শুরু করলে : ১. দেশে কোন গ্যাস ও সেইহেতু বিদ্যুৎ সংকট থাকবে না। ২. নিজেদের দেশের গ্যাস তুলতে বা কিনতে গিয়ে আর্থিক চাপে পড়তে হবে না। ভর্তুকির চাপ তৈরি হবে না। ৩. মাগুরছড়া বা টেংরাটিলার মতো ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞের সম্ভাবনা থাকবে না। ৪. সুলভে ও নিশ্চিতভাবে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ সম্ভব হবে। এবং ৫. এর অব্যাহত দামবৃদ্ধির নতুন চাপ তৈরি হবে না।
জাতীয় মালিকানায় জাতীয় সংস্থার মাধ্যমে এসব গ্যাসক্ষেত্র থেকে গ্যাস উত্তোলনে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করলে খুব দ্রুতই তা শুরু করা সম্ভব। প্রয়োজন অনুযায়ী গ্যাস প্রাপ্তির পথে বাধাও তখন দূর হবে। এটা করলে বারবার গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির কারণও দূর হবে। তেলের ওপর নির্ভরশীলতাও হ্রাস পাবে। একইভাবে বিদ্যুৎ খাতেও মৌলিক পরিবর্তন আনা সম্ভব। তবে সরকার নির্বিশেষে যে নীতিকাঠামো জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের ওপর বিদেশী কোম্পানি ও দেশী কমিশনভোগীদের আধিপত্য তৈরি করেছে, তার আমূল পরিবর্তন ছাড়া এ সহজ কিন্তু অত্যাবশ্যকীয় কাজটি সম্ভব হবে না।

বিদেশি কোম্পানির স্বার্থেই দাম বাড়ছে

জ্বালানি তেলের দাম আরেক দফা বাড়ানোয় জনজীবনে এর চাপ পড়েছে, দ্রব্যমূল্যও বৃদ্ধির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এ বিষয়ের কার্যকারণ নিয়ে অর্থনীতিবিদ আনু মুহাম্মদ-এর লেখা প্রকাশ করা হলো।
তেল-গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ার পেছনে প্রধান যুক্তি হলো ভর্তুকি। ভর্তুকি দিন দিন বাড়ছে এবং তা কমানোর যুক্তিতেই প্রতিবার দাম বাড়ানো হয়। কোনো সরকারের পক্ষ থেকে কখন কেন ভর্তুকি দেওয়া হচ্ছে, কেন তা বাড়ছে, এর কার্যকর ব্যাখ্যা এবং সেই কারণগুলো দূর করার পদক্ষেপ নেওয়া হয় না। গ্যাসের ভর্তুকি বাড়ানোর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি। এই চুক্তির কারণে গত সাত বছরে বিদেশি কোম্পানির থেকে ১৬ হাজার কোটি টাকার গ্যাস কিনেছে সরকার। অথচ জাতীয় সংস্থাগুলোর কাছ থেকে এটা দুই হাজার কোটি টাকাতেই কেনা সম্ভব ছিল। সুতরাং সাত বছরে ভর্তুকি বাবদ গেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর আড়াই হাজার কোটি টাকা করে, সামনে তা আরও বাড়বে। এই টাকা জোগাতে সরকারকে প্রতিবছর ঋণ করতে হচ্ছে। ঋণের সুদও বাড়ছে। তার জন্য আবার নতুন নতুন ট্যাক্স, ভ্যাটসহ করের আওতা প্রসারিত করে জনগণের ওপর চাপ বাড়ানো হচ্ছে।
বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও গত কয়েক বছরে রেন্টাল ও কুইক রেন্টালের মাধ্যমে দুই টাকা ইউনিটের বিদ্যুৎ ১২-১৪ টাকায় কিনতে হচ্ছে। এ খাতেও নতুন চুক্তি হয় আর ভর্তুকির চাপ বাড়ে। গ্যাস ও বিদ্যুৎক্ষেত্রের এই ভর্তুকি জনগণের প্রয়োজনে নয়। তা আসলে বিদেশি কোম্পানি এবং তাদের দেশীয় কতিপয় সহযোগীর সুবিধার জন্য। অথচ বলা হয় উল্টোটা। এই ভর্তুকির ধারা ও চুক্তিগুলো যদি অব্যাহত থাকে, তাহলে কয়েক মাস পর পর আমরা দেখব, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হচ্ছে। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও তেলের দাম বাড়লে সমগ্র অর্থনীতিতে ভয়ানক চাপ সৃষ্টি হয়। ভর্তুকি মেটাতে ১০ টাকা দাম বাড়ার ফলাফল জনগণের ওপর প্রায় ৫০ টাকায় গিয়ে দাঁড়ায়।
তেলের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর। তেলের আন্তর্জাতিক দামে কোনো স্থিরতা নেই। আন্তর্জাতিক ফাটকা পুঁজি অত্যন্ত সক্রিয় হয়ে ওঠার কারণে দামও ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে তেল আমদানি বাবদ ব্যয়টাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক দর বিবেচনা করে তেলের চাহিদার পর্যালোচনাও কোনো সরকার করেনি। তেলের চাহিদার অগ্রাধিকার নিয়ন্ত্রণও করা হয়নি। এদিকে তেলনির্ভর বিভিন্ন বিদ্যুৎ প্ল্যান্টের অনুমোদন দিয়ে সমস্যাকে আরও গভীর করা হচ্ছে। গাড়ি আমদানি কমাতেও সরকারের চাহিদা-ব্যবস্থাপনা নেই। যে পরিমাণ তেল আমদানি হয়, সেই পরিমাণ তেল আদৌ ব্যবহূত হয় কি না সন্দেহ। বাংলাদেশ প্রধানত অপরিশোধিত তেল আমদানি করে। তা শোধন করা হয় দেশের একমাত্র শোধনাগারে। তেল শোধনাগারের ক্ষমতার চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বেশি তেল বাংলাদেশ আমদানি করে। এই তেল কোথায় যায়, সেই বিষয়টি একটা রহস্য। এর কোনো সন্তোষজনক জবাব আমরা কারও কাছ থেকে পাইনি।
আমদানির পরিমাণ ও চাহিদা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন আছে। বিশেষত সরকারি খাতে তেলের ব্যবহার, বিভিন্ন বেসরকারি কোম্পানির স্বার্থে তেলের ব্যবহার এবং ভোগবিলাস কমানো নিয়ে সরকারের মাথাব্যথা নেই। জ্বালানি খাতের প্রতিটি উপাদান তথা তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। ১৯৯৩ সাল থেকে জ্বালানি খাতে যেসব নীতি সরকার নিয়েছে এবং যেসব চুক্তি করেছে, তাতে জাতীয় স্বার্থ বিসর্জিত হয়েছে। এসবের ধারাবাহিকতাতেই নব্বইয়ের দশকের শেষ দিকে গ্যাস রপ্তানির আওয়াজ উঠেছিল। সে সময় রপ্তানি ঠেকাতে সক্ষম না হলে এখন আমাদের আরও বেশি তেল আমদানি করতে হতো। তার জন্য প্রতিবছর কমপক্ষে ২০ হাজার কোটি টাকা বাড়তি খরচ হতো। লোডশেডিং এবং শিল্প ও কৃষিতে বিদ্যুতের ঘাটতিও দ্বিগুণের বেশি হতো।
সুতরাং জ্বালানি খাতে তেলের ওপর নির্ভরতা কমানোর জন্য চাহিদা নিয়ন্ত্রণ দরকার, তেমনি গ্যাস-কয়লার ওপর জাতীয় সংস্থার মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠারও বিকল্প নেই। জাতীয় সংস্থাকে শতভাগ গ্যাস উত্তোলনের সুযোগ দেওয়া হলে গত সাত বছরে ১৪ হাজার কোটি টাকার ভর্তুকি গুনতে হতো না। এই পরিমাণ অর্থ শিক্ষা-চিকিৎসা-পরিবহন এবং জ্বালানি খাতে খরচ করা সম্ভব হতো। বাংলাদেশের জনগণ কম দামে গ্যাস এবং বিদ্যুৎও পেতে পারত। এই পরিমাণ অর্থ বাংলাদেশের বর্তমানে জ্বালানি খাতে বার্ষিক বরাদ্দের প্রায় তিন গুণ।
প্রথমত, ভর্তুকির যুক্তি দিয়ে ঘন ঘন তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রক্রিয়াটিও অর্থনীতির নিয়মবিধির পরিপন্থী। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন নামের একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও তা কার্যকর ও দাম নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়নি। এই প্রতিষ্ঠান গ্যাস ও বিদ্যুতের ভর্তুকি নিয়ে যতটা আগ্রহী, ভর্তুকির গোড়ার কারণের প্রতি ততটাই অনাগ্রহী। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে জ্বালানির দাম বাড়ানোর মাধ্যমে বিজাতীয় স্বার্থকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই এই কমিশন ব্যবহূত হচ্ছে। আবার কমিশনকে পাশ কাটিয়েও সরকার গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ায়। এ থেকে প্রমাণিত হয়, এই প্রতিষ্ঠানের কোনো কার্যকারিতা নেই।
দ্বিতীয়ত, বাজেট হচ্ছে একটা বছরে অর্থনীতির আয়-ব্যয়ের হিসাব। বাজেটের প্রক্রিয়ার বাইরে সরকার তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়াতে পারে না। কারণ, এই বৃদ্ধির প্রভাব বাজেটের সব বরাদ্দকে প্রভাবিত করে এবং জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয়, উৎপাদন ব্যয় এবং পরিবহন ব্যয়ের ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু প্রায়ই দেখা যায়, বাজেট ঘোষণার আগে ও পরে গ্যাস-বিদ্যুৎ-তেলের দাম বাড়ানো হয়, এবারও হয়েছে। তার মানে অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার বড় অংশ বাজেট কাঠামোর বাইরে নির্ধারিত হচ্ছে। এর থেকে স্পষ্ট হচ্ছে, সরকারের নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে বাজেট বা সংসদের গুরুত্ব নেই।
সিএনজি-বিদ্যুৎ-তেলের দাম বাড়ানোর ক্ষেত্রে আরেকটি যুক্তি জনপ্রিয় করার চেষ্টা হয় যে এর সুবিধাভোগী বিত্তবানেরা। যাঁদের ক্ষমতা আছে তাঁরা বর্ধিত দামে ওসব কিনবেন। কিন্তু অভিজ্ঞতা থেকে আমরা স্পষ্টতই দেখি, বিদেশি কোম্পানি, তাদের দেশীয় সহযোগীসহ কতিপয় বড়লোকের স্বার্থেই এই দাম বাড়ানো হয়। সিএনজির দাম যখন বাড়ে, তখন একে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে পরিবহনমালিকেরা তেল ও গ্যাসের দামের চেয়ে অনেক বেশি হারে ভাড়া বাড়ান। একই অজুহাতে কতিপয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং আমদানিকারক সিন্ডিকেট দ্রব্যমূল্যও বাড়ায়। অন্যদিকে প্রকৃত শিল্পোদ্যোক্তা ও কৃষকেরা উৎপাদন ব্যয় বাড়ার চাপে পড়েন। পরিণতিতে নতুন অনেক মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে পতিত হয়। জীবনযাত্রার মান রাখতে গিয়ে অধিকতর ব্যয় করতে হয়। ফলে শিক্ষা ও চিকিৎসা খাতে ব্যয় সংকোচন করতে হয়। এই প্রক্রিয়া সরকারি ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্রমাগত জনগণের পকেট কাটার শামিল।
জ্বালানি খাতে দেশি-বিদেশি দুর্নীতি এবং এর সহযোগী হিসেবে বিভিন্ন নীতি ও চুক্তি অবিরামভাবে তেল-গ্যাস-বিদ্যুতের দাম বাড়ার প্রধান কারণ। জ্বালানি খাতে ভর্তুকি দূর করার সহজ উপায় হচ্ছে ভর্তুকির কারণ দূর করা। ভর্তুকির কারণ সৃষ্টি হচ্ছে বহুজাতিক কোম্পানি এবং দেশীয় কমিশনভোগীদের স্বার্থ রক্ষার উদ্দেশ্যে গৃহীত নীতি ও চুক্তির কারণে। এই নীতি ও চুক্তির ধারা অব্যাহত থাকলে একদিকে অপ্রয়োজনীয় ভর্তুকির চাপ বাড়বে, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়তেই থাকবে।

উন্মুক্ত হওয়া আর অধীনস্থ হওয়া এক কথা নয়

ভারত বাংলাদেশকে ঘিরে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে, দিচ্ছে। কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে বসবাস করলে খাঁচায় বসবাসের অনুভূতি হয়, আমারও তাই হচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বন্ধুত্বের আহবান নিয়ে বাংলাদেশ সফরে আসছেন। কিন্তু খাঁচা থেকে আমরা কী করে বন্ধুত্বের হাত বাড়াবো?
আমাদের সমুদ্রসীমায় ভারত দাবি জানিয়েছে, মায়ানমারও আমাদের সীমায় দাবি উপস্থিত করেছে, তাতেও মূল ভূমিকা পালন করেছে ভারতীয় বিশেষজ্ঞরাই। ভারত ও মায়ানমারের এই দাবির ফলে আমাদের সমুদ্রসীমার এক বড় অংশ হুমকির মুখে। বঙ্গোপসাগরে একদিকে ভারত ও মায়ানমারের দাবি অন্যদিকে মার্কিনীদের হাতে সরকারের গ্যাসব্লক তুলে দেয়ার ফলে পরিস্থিতি এমন যে, বাংলাদেশের সমুদ্রে বাংলাদেশেরই দাঁড়ানো অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে।
কাঁটাতার দেয়া সীমান্তে হত্যাকান্ড এখনো বন্ধ হয়নি। এখন আগ্নেয়াস্ত্রের বদলে অনেকক্ষেত্রে ব্যবহার হচ্ছে বেয়োনেট ও লাঠি। নিহত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ভারত রাষ্ট্রের অভিযোগ তারা সন্ত্রাসী কিংবা চোরাচালানী। দেশের মধ্যে রাবের হাতে যারাই খুন হয় তারা যেমন সন্ত্রাসী হয়ে যায়, সীমান্তে ভারতীয় বাহিনীর হাতেও তেমনি। ১২ বছরের বালিকারও নিষ্কৃতি নেই এই অপবাদ থেকে। আর চোরাচালানী কি এই গরীব মানুষেরাই করে? তাতে শুধু কি বাংলাদেশের লোকজনই জড়িত থাকে? সীমান্তে কখনো বাংলাদেশ বাহিনীর হাতে ভারতীয় নিহত হয় না, কিন্তু নিয়মিতভাবে নিহত ও জখম হয় বাংলাদেশের কিশোরীসহ বিভিন্ন বয়সের গরীব মানুষ। বর্তমানে ভারতের সাথে বাংলাদেশের বৈধ বাণিজ্য ৪০০ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি, এর শতকরা ১০ ভাগ বাংলাদেশ রফতানি করে। ধারণা করা হয় অবৈধ বাণিজ্য এর প্রায় সমপরিমাণ কিংবা আরও বেশি। এই বাণিজ্য ভারতীয় অর্থনীতিকে চাঙ্গা করছে, বাংলাদেশে তৈরি করছে তাদেরই বাজার। প্রাথমিক লাভ ভারতীয় ব্যবসায়ীদেরই।
ভারতের সাথে তুলনা করলে বাংলাদেশ অনেক উন্মুক্ত, অনেক উদার। বাংলাদেশে ভারতের পণ্য, বিনিয়োগ, শ্রম, পরিষেবা, প্রতিষ্ঠান আসায় কোন বাধা নেই, বাংলাদেশে ভারতের বহুসংখ্যক টিভি চ্যানেল দেখতে কোন বাধা নেই। কিন্তু ভারতে বাংলাদেশের পণ্য থেকে শুরু করে টিভি চ্যানেল পর্যন্ত সবকিছুতেই নানাবিধ বাধা আছে। ভারতীয় টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে আমরা অবিরাম ভারতে উৎপাদিত পণ্যের বিজ্ঞাপন দেখি, এর মাধ্যমে বাংলাদেশে তাদের বাজার সম্পসারিত হয়। কিন্তু বাংলাদেশের চ্যানেল ভারতে কার্যত নিষিদ্ধ থাকায় এখানকার পণ্যের খবর ভারতে যায় না। নৌপথে ভারত ট্রানজিট সুবিধা অনেক আগে থেকেই পাচ্ছে, এখন পেতে যাচ্ছে সড়ক ও রেলপথে, কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ নেপাল বা ভূটানে যাবার জন্য ভারতের ৩০/৪০ কিমি ব্যবহার শুরু করতে পারেনি।
ভারতের জন্য বাংলাদেশের মধ্য দিয়ে যেধরনের ‘ট্রানজিট’ প্রস্তুতি চলছে তার কোন তুল্য দৃষ্টান্ত পৃথিবীতে নেই। একমাত্র কাছাকাছি হল দক্ষিণ আফ্রিকা দিয়ে চারদিকে ঘেরাও হয়ে থাকা লেসোথো। কিন্তু এটিও তুলনীয় নয়; কারণ, সোনার খনি নিয়েও লেসোথো রাষ্ট্র হিসেবে প্রায় ভেঙে পড়েছে, আয়ুসীমা ৩৪ বছর, মারিজুয়ানা চাষের উপর নির্ভর অনেক কর্মসংস্থান, আর লেসোথোর মানুষ নিজেরাই দক্ষিণ আফ্রিকার দশম প্রদেশ হবার আবেদন করছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নকেও এর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না দুটো কারণে। প্রথমত, দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিক রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে এতটা অসমতা নেই, যেটি বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আছে। দ্বিতীয়ত, সেখানে কোন দেশই অন্যদেশের ভূমি বা নৌপথ ব্যবহার করে নিজদেশেরই অন্য প্রান্তে যায় না, যায় তৃতীয় কোন দেশে।
বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে অবাধ যোগাযোগ ভারতের জন্য অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সবদিক থেকেই খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন সমীক্ষা থেকে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশ যদি ভারতকে এই সুবিধা দেয় তাহলে ভারতের পরিবহণ ব্যয় কমে যাবে দুই তৃতীয়াংশেরও বেশি, অর্থাৎ আগে যে পণ্য পরিবহণে খরচ হতো ১০০ টাকা তার খরচ দাঁড়াবে ৩০ টাকারও কম। এছাড়া সময় লাগবে আগের তুলনায় ২৫ শতাংশ, বা চারভাগের এক ভাগ। এই সময় ও অর্থ সাশ্রয় বহুগুণে তাদের অর্থনেতিক সম্পদ ও সম্ভাবনা বৃদ্ধিতে কাজে লাগবে। ভারতের এত লাভ যেখানে, বাংলাদেশের সেখানে প্রাপ্তি কী? আমাদের সার্ভিস ও অবকাঠামোর সুযোগ ব্যয় কত? কী কী লাভ, আর কী কী ক্ষতি বা সমস্যা? কোনটার চাইতে কোনটা বেশি?
‘ট্রানজিটের’ লাভক্ষতি নিয়ে সরকার থেকে কোন হিসাবনিকাশ আমাদের জানানো হয়নি। অথচ মন্ত্রী কিংবা বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে বহুবার বলা হয়েছে ট্রানজিট বাংলাদেশের জন্য খুব লাভজনক, দেয়া হয়েছে হাজার হাজার কোটি টাকার লাভের অংক। কীভাবে ট্রানজিট বিষয়ে দুইদেশের সরকারের বিস্তারিত সিদ্ধান্তের আগে এবিষয়ে অংক দেয়া যায় তা আমার বোধগম্য নয়। বাংলাদেশের পক্ষ হয়ে ভারতের সাথে সব চুক্তির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দুজন উপদেষ্টা বিশেষভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত। তাঁরা ইতিমধ্যে অনেক কথা বলেছেন, তা থেকে পরিষ্কার হয়েছে যে, যেকাজে তাঁরা দায়িত্বপ্রাপ্ত তাতে বাংলাদেশের স্বার্থ বিষয় তাদেঁর কাছে বোধগম্য নয়। আরও পরিষ্কার হয়েছে যে, তাঁরা যেকোন মূল্যে চুক্তি করতে অতি আগ্রহী, এবং নিশ্চিত যে, ভারতই বাংলাদেশের স্বার্থ সংরক্ষণ করবে। উপদেষ্টা মশিউর রহমান এতদূর বললেন যে, সভ্যদেশ হিসাবে বাংলাদেশ ট্রানজিট ফি চাইতেই পারে না। অবশ্য পরে ফি নির্ধারণের জন্য কমিটি করা হয়েছে। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা বলেছেন, ট্রানজিট নিয়ে নতুন কোন চুক্তিরই দরকার নেই, ১৯৭২ সালেই সব চুক্তি করা আছে! যাদের দরকষাকষি করবার কথা, তারাই যদি আগে থেকে বলতে থাকেন এতে বাংলাদেশেরই লাভ হবে, তাহলে দরকষাকষির আর কী সুযোগ থাকে?
শুধু গাড়িভাড়া বন্দরভাড়া হিসাব করলেই তো হবে না। আগপাছ বিচার না করে শুধু টাকার জন্য নিজের যেকোন কিছু ভাড়া দেয়া একজন আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন ব্যক্তির পক্ষেও সম্ভব নয়। সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্য তো তা আরও অচিন্তনীয়। তাই শুধু টাকার প্রশ্ন নয়, বাংলাদেশের জন্য আরও অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকি নিয়ে প্রশ্ন আছে। প্রথমত, বাংলাদেশের জমি সীমিত, আবাদী জমি নষ্ট করা তাই খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। ভারতের ক্রমবর্ধমান পণ্য পরিবহণ করতে গিয়ে যে সড়ক স¤প্রসারণ ও সংযোজন করতে হবে তা কত কৃষিজমি জলাভূমি বিনাশ করবে? এরফলে খাদ্যসহ অন্যান্য কৃষি উৎপাদন, জীববৈচিত্র কত বিনষ্ট হবে? কত পরিবেশ দূষণ হবে? দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের নিজের পণ্য পরিবহণ ভবিষ্যতে অনেক বাড়বে। এখনই বিভিন্ন রাস্তায় জটের কারণে পণ্য পরিবহণ বাধাগ্রস্ত হয়, পচনশীল দ্রব্য বিনষ্ট হয়, দ্রব্যমূল্য বাড়ে। ভারতকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে আমাদের পণ্যপ্রবাহে কীরকম সমস্যা তৈরি হতে পারে? তৃতীয়ত, যে রাজ্যগুলোতে ভারত পণ্য নিয়ে যাবে, সেসব রাজ্য এতদিন ছিল বাংলাদেশের বহু শিল্পপণ্যের বাজার। সেই বাজার সংকুচিত হয়ে যাবে, সম্ভাবনা বিনষ্ট হবে। তার ক্ষতি কত? চতুর্থত, যেখানে ভারত বাংলাদেশকে ‘সন্ত্রাসী’ বিবেচনা করে তিনদিকে কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করে রাখে, সেখানে বাংলাদেশ ভেদ করে তার পণ্য পরিবহণে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কে করবে? কী পণ্য ভারত নিয়ে যাচ্ছে তার তদারকির ব্যবস্থা কী থাকবে? পঞ্চমত, নদী, সমুদ্র, কাঁটাতার, অসম প্রবেশাধিকার, সীমান্ত হত্যা নিয়ে আগে সমাধান কেন নয়?
এসব প্রশ্নের উত্তর না দিয়েই ভারতের কাছ থেকে কঠোর শর্তযুক্ত ঋণ নেবার চুক্তি হয়েছে তাদেরই কাঙ্খিত পণ্য পরিবহণব্যবস্থা দাঁড় করবার জন্য। মাত্র ১০০ কোটি ডলারের এরকম শর্তযুক্ত ঋণের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের কমই আছে, যেখানে সবকিছু ভারত থেকে কিনতে হবে, সব সিদ্ধান্ত তাদের। বাংলাদেশের দায়িত্ব শুধু তাদের নির্দেশমতো কাজ করা এবং সময়মতো সুদসমেত ঋণের টাকা ফেরত দেয়া। এই ঋণকেই বিশাল অর্জন বলেছেন অর্থমন্ত্রী।
ট্রানজিট নিয়ে লাভের নানা কাল্পনিক হিসাব দিতে ব্যস্ত না থেকে নীতিনির্ধারকরা নানা সমাধান খুঁজতে পারতেন। ভারতের প্রয়োজন ও বাংলাদেশের জটিলতায় না পড়বার মতো একটা সমাধান হতে পারতো – সীমান্ত জুড়ে বাংলাদেশের প্রান্তে বিশাল শিল্প বেল্ট তৈরির উদ্যোগ গ্রহণ। কাঁচামাল ও প্রযুক্তি ক্ষেত্রে এবং বাজারে বাংলাদেশের প্রবেশাধিকারে ভারত যদি অনুকূল অবস্থান নেয়, তাহলে বাংলাদেশের সরকারী ও বেসরকারী কিংবা যৌথ উদ্যোগে এই রাজ্যগুলোর চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন প্রতিষ্ঠানের বিস্তার খুবই সম্ভব। বর্তমানে এসব রাজ্যে বাংলাদেশের শিল্পপণ্য সরবরাহ সাফল্যে এই সক্ষমতার ইঙ্গিত আছে। ভারতকে তাহলে এতদূর পণ্য টেনে আনার কষ্ট করতে হতো না, বাংলাদেশের শিল্পভিত্তি শক্তিশালী হতো, আবার উত্তর পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলোর অর্থনীতিও চাঙ্গা হতো। কিন্তু ভারতের আগ্রহ নেই এরকম কোন কিছুই আলোচনার টেবিলে নেই।
শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়, আমি উন্মুক্ত বিশ্বের পক্ষে। আমি চাই, সারাবিশ্বের কাছে বাংলাদেশ উন্মুক্ত থাকুক, সারাবিশ্বও বাংলাদেশের কাছে উন্মুক্ত হোক। আমরা ভারত চীন বা যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিশ্বের শক্তিশালী ও ক্ষমতাবানদের জন্য দরজা জানালা সব খুলে দিলাম, আর এসব দেশে বাংলাদেশের পণ্য ও মানুষের প্রবেশাধিকার কঠোর ভাবে নিয়ন্ত্রিতই থাকলো- এটা উন্মুক্ত হওয়া নয়। উন্মুক্ত হওয়া আর আত্মসমর্পণ কিংবা অধীনস্থ হওয়া এক কথা নয়। এই দুইএর পার্থক্য বোঝার মতো আত্মসম্মানবোধ আমাদের মধ্যে তৈরি হওয়া দরকার।

কেন তবু জিনিসপত্রের দাম বাড়তেই থাকে?

মানুষ এখন শুধু জিনিসপত্রের দাম বাড়ার কারণে যে অস্থির, তা নয়, অস্থির ও ক্রুদ্ধ সরকারের নানা ব্যক্তির অসংলগ্ন কথাবার্তা এবং স্পষ্টতই ‘অর্থহীন’ তৎপরতায়ও। তাঁদের কর্মকাণ্ডে বাজার আরও তেজি হয়, লাভবান হয় কিছু লোক, বহু ব্যক্তির জীবন অতিষ্ঠ হয়। বাণিজ্যমন্ত্রীর দাম কমানোর প্রতিশ্রুতি শুনলেই মানুষ তাই আতঙ্কিত হয়, যেমন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সন্ত্রাস দমনের কথা শুনলে সন্ত্রস্ত হয়। বাণিজ্যমন্ত্রী মানুষকে কম খেতে বলেছেন। আর কত কম খাবে মানুষ? সরকারি দলিল বলছে, শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই তাদের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম পুষ্টি গ্রহণ করতে পারছে, শতকরা পাঁচ জন গ্রহণ করছে প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বেড়েছে দুই গুণ; কিন্তু একই সময়ে খাদ্যের উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। কেন তবে কম খাবে মানুষ?
২.
অর্থশাস্ত্রের সাধারণ ব্যাখ্যা অনুযায়ী, জিনিসপত্রের দাম বাজারের চাহিদা-জোগানের ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। জোগান স্থির থেকে চাহিদা বাড়লে জিনিসপত্রের দাম বাড়ে, চাহিদা কমলে দাম কমে। অথবা জোগান যতটা আছে, চাহিদা যদি তার চেয়ে বেশি হয়, তাহলে দাম আগের তুলনায় বেড়ে যায়। আবার চাহিদা স্থির থাকলে, মানে চাহিদার ক্ষেত্রে তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না, কিন্তু জোগান বেড়ে গেল, তাহলে দাম কমে যাবে। অথবা জোগান যতটা আছে, তার চাহিদা সেই রকম নেই, তা হলেও দাম কমে যাবে।
চাল, ডাল, মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন কিংবা বাসভাড়া-ঘরভাড়া যা-ই হোক না কেন, তার দাম যদি বাড়তে থাকে, তাহলে প্রচলিত অর্থশাস্ত্রীয় নিয়ম অনুযায়ী কারণ খোঁজার জন্য চাহিদা-জোগানের দিকেই তাকানো হয়। জোগান কমে যেতে পারে, কোনো কারণে যদি উৎপাদন কমে যায়, কিংবা যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা কোনো কারণে উৎপাদন বিনষ্ট হয়, কিংবা যদি উৎপাদন-পরবর্তী বিপণন কোনো না কোনো কারণে বাধাগ্রস্ত হয়। চাহিদা বেড়ে যেতে পারে দুইভাবে: এক. কোনো নির্দিষ্ট উপলক্ষ ধরে কোনো নির্দিষ্ট একটি বা একগুচ্ছ দ্রব্যের চাহিদা বেড়ে যেতে পারে; কিংবা দুই. সাধারণভাবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ায় নিকৃষ্ট পণ্য ছাড়া বাকি সব পণ্যেরই চাহিদা বেড়ে যেতে পারে।
প্রথম কারণটি বিশেষ উপলক্ষ ধরে হয় বলে তা সাধারণ চিত্র হওয়ার কথা নয়। যেমন—রমজান মাসে বাংলাদেশে মুড়ি, পেঁয়াজ ও ছোলার চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। কিন্তু চাহিদার এই বৃদ্ধি যেহেতু নির্দিষ্ট সময়ের এবং আগে থেকেই জানা, সে জন্য এর জোগানও বেড়ে যায়। রমজান মাসে বিভিন্ন স্থান থেকে যে পরিমাণ মুড়ি এবং দোকানে দোকানে ছোলা, পেঁয়াজ, জিলাপি উৎপাদিত হয়, বছরের আর কোনো সময়েই তা হয় না। এতে বর্ধিত চাহিদা উপস্থিত হলেও অধিকতর বর্ধিত জোগান আসায় দাম বাড়ার কথা নয়। তবু বাড়ে!
রমজান মাস যদিও সংযমের মাস, কিন্তু রোজা রাখার সুবাদে বা তার উপলক্ষে খাওয়াদাওয়ার প্রতি একটু বিশেষ মনোযোগ দেন একেবারে অক্ষম ছাড়া সবাই। এ কারণে তেল, চিনি, ডাল, মাছ, মাংস, দুধ, মিষ্টি, সবজিসহ তৈরি করা নানা খাবারের চাহিদা বাড়ে। আবার জোগানও বাড়ে। কিন্তু দামও বাড়ে, বাড়ছেই। রমজান মাসে এবং আগে থেকেই জিনিসপত্রের এই মূল্যবৃদ্ধি তাই শুধু অর্থনীতির চাহিদা-জোগান দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এখানে আরও বিশেষ ভূমিকা পালন করে নিত্যপ্রয়োজনীয় কোনো কোনো পণ্যের ক্ষেত্রে চাহিদার অনমনীয়তা। দাম বাড়লেও চাহিদা এখানে কমে না। এই অনমনীয়তা বা বাধ্যবাধকতার সুযোগটিই গ্রহণ করতে চেষ্টা করেন ব্যবসায়ীরা।
৩.
ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর মাধ্যমে সাধারণভাবে অর্থনীতিতে গড় চাহিদা বেড়ে যেতে পারে। কিন্তু আমাদের অর্থনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সব পর্যায়ের পেশাজীবীসহ আয়ের দিকটা বিশ্লেষণ করলে ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। ক্রয়ক্ষমতা বাড়ার আরেক নাম প্রকৃত আয়ের বৃদ্ধি। টাকাপয়সার আয় বাড়লেই ক্রয়ক্ষমতা বাড়বে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। যদি দামস্তর বেড়ে যায়, মুদ্রাস্ফীতি হয়, টাকার মূল্য বা ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তাহলে টাকার অঙ্কে আয় বাড়লেও প্রকৃত আয় কমে যেতে পারে।
আয়ের বিশ্লেষণ করলে আমরা বরং একটি বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রকৃত আয়ের নিম্নগতি দেখি। ৩০ বছর আগের ও পরের টাকার অঙ্কে মজুরি ও দামস্তর নিয়ে সাধারণ হিসাবেই প্রকৃত চেহারাটি পাওয়া যাবে। আমরা যদি তুলনার জন্য দুই সময়ের গড় ও ন্যূনতম মজুরি বিবেচনা করি, তাহলে পরিষ্কার তথ্য পাওয়া যায় যে শিল্পশ্রমিকদের গড় প্রকৃত মজুরি ৩০ বছর আগের তুলনায় অন্তত এক-তৃতীয়াংশ কমেছে। পেশাজীবীদের মধ্যে যদি সর্বোচ্চ পর্যায়ের লোকদের কথাই বিবেচনা করি, যেমন—সচিব, যুগ্ম সচিব কিংবা রাষ্ট্রীয় কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, সহযোগী অধ্যাপক কিংবা প্রকৌশলী, ডাক্তারদের—দেখব, গত ৩০ বছরে টাকার অঙ্কে তাঁদের বেতন বেড়েছে ১০ থেকে ২০ গুণ। কিন্তু এই সময়কালে সাধারণ দামস্তর আরও বেড়েছে; কমপক্ষে ৩০ গুণ।
তবে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। চাহিদার মধ্যে বৈচিত্র্য এসেছে। প্রায় সবকিছুই বাজার থেকে কিনতে হয়—এ রকম মানুষ বাড়ছে। তাতে চাহিদার অনেক সম্প্রসারণ হয়েছে। আবার জোগানও বেড়েছে, কোনো কোনো পণ্যের জোগানই চাহিদা তৈরি করেছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আয়ের গতিসহ এই নানা দিক বিবেচনা করলে তাই কোনোভাবেই বলা যায় না যে জোগানের তুলনায় অসমানুপাতিক হারে গড় চাহিদা বেড়েছে।
প্রকৃত আয় বেশির ভাগ মানুষের ক্ষেত্রে কমে গেছে—এই তথ্যে আমাদের খটকা লাগার যথেষ্ট কারণ আছে। দুটি প্রশ্ন সঙ্গে সঙ্গে মাথায় এসে বিড়বিড় করতে পারে। যেমন: ১. তা-ই যদি হয়, তাহলে এত কেনাকাটা, এত বাজার কী করে চলছে? ২. কী করে নিম্ন-মধ্যবিত্ত পর্যায়েও নতুন নতুন পণ্য যোগ হয়েছে?
পরিস্থিতির এই আপাত-স্ববিরোধিতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এর উত্তর পেতে গেলে অর্থনীতির ধরনে কী কী পরিবর্তন হয়েছে, সেই দিকে তাকাতে হবে। দেখতে হবে, প্রতিটি পরিবারে কীভাবে একজনের বদলে একাধিক ব্যক্তির উপার্জনের তাগিদ তৈরি হয়েছে, বেশি সময় কাজ করতে হচ্ছে, নির্দিষ্ট আয়ের বাইরে আয়ের নানা পথ ও পেশা তৈরি হচ্ছে, প্রবাসী-আয়ের প্রবাহ যোগ হয়েছে, সমাজের একটি অংশের আয়ের বিপুল বৃদ্ধি ঘটেছে; বিভিন্ন ধরনের ঋণবাজার কৃত্রিম ক্রয়ক্ষমতা তৈরি করেছে এবং সর্বোপরি বাজার সম্পর্কের বিকাশ ও ভোগবাদিতার সম্প্রসারণ পণ্য উন্মাদনার প্রসার ঘটিয়েছে।
৪.
চাল, ডাল, চিনি, সবজি ইত্যাদির জোগানধারা খেয়াল করলে আমরা স্পষ্টই দেখি, জোগান যে কম হচ্ছে, তা নয়। তাহলে খাদ্যসহ জিনিসপত্রের ক্ষণে ক্ষণে, ধীরে কিংবা লাফিয়ে মূল্যবৃদ্ধি কেন? দেশের ভেতর যেসব পণ্যের উৎপাদনে নানা কারণে ঘাটতি হচ্ছে, সেসব পণ্যের জোগানে বৈধ আমদানি বা চোরাচালান (অবৈধ আমদানি) বিশেষ ভূমিকা পালন করছে। যেসব আমদানিকৃত পণ্যের আমদানি দামও বাড়েনি, সেগুলোরও অভ্যন্তরীণ দাম বাড়ছে (দেখুন প্রথম আলো, ৪ আগস্ট ২০১১)। কেন? এমন অনেক পণ্যের বাজারদর চড়া থাকছে, যেগুলো দেশে উৎপাদিত এবং উৎপাদনের স্তরে, সেই পণ্যের দাম ভোক্তার পর্যায়ে দামের তুলনায় অনেক কম। যখন ঢাকার বাজারে মাছ, সবজি, চাল ইত্যাদির দাম বাড়ছে, তখন রাজশাহী, জামালপুর বা দিনাজপুরের উৎপাদকের প্রাপ্তি দাম বাড়ছে না। তাহলে বর্ধিত দাম যাচ্ছে কোথায়?
এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলেই আমরা পাব ‘মুক্ত বাজার’-এর আড়ালে কতিপয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণ ও একচেটিয়া কর্তৃত্বের সন্ধান। শনাক্ত হবে কতিপয় আমদানিকারক, কতিপয় পাইকার ও পণ্য বাজারজাত-প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের পৃষ্ঠপোষকতায় খাজনা বা চাঁদাবাজ গোষ্ঠীর দাপট। চাহিদা-জোগানের অদৃশ্য হস্ত নয়, কতিপয় সংগঠিত গোষ্ঠীর দৃশ্যমান হস্ত দিয়েই অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধির রহস্য বোঝা যাবে। বাজার যে কতিপয় গোষ্ঠী প্রচলিত কথায় ‘সিন্ডিকেট’ দ্বারাই পরিচালিত হচ্ছে, তার সর্বশেষ চিত্র ‘নিত্যপণ্যের বাজার পাঁচ শিল্প গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে’ শীর্ষক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনেও স্পষ্ট হয়েছে (প্রথম আলো, ১ আগস্ট ২০১১)।
৫.
এসব তৎপরতা দুর্নীতি বলেই সাধারণভাবে গণ্য। কিন্তু দুর্নীতি কোনো আলগা বিষয় নয়। এর শিকড় সরকারনির্বিশেষে, নীতি-কাঠামোর (পলিসি ফ্রেমওয়ার্ক) মধ্যেই দেখতে হবে, যা অবিরাম মূল্যবৃদ্ধির প্রক্রিয়া জোরদার করছে। মূল্যবৃদ্ধির আন্তর্জাতিক মাত্রাটিও গুরুত্বপূর্ণ। কাঁচামাল ও জ্বালানির দাম এবং সেই সঙ্গে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় আর শুধু কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। পুঁজির আন্তর্জাতিকীকরণ-প্রক্রিয়ায় এটি এখন অনেক বেশি বিশ্বায়িত। তবে এগুলো মোটেই কথিত মুক্তবাজারের মধ্য দিয়ে ঘটে না, ঘটে একচেটিয়া পুঁজির কতিপয় বাহুর কঠোর নিয়ন্ত্রণ দিয়ে। এই কতিপয় বাহুর মধ্যে যেমন আছে একচেটিয়াকৃত বিশ্ববাজার, বহুজাতিক কোম্পানি, সেই সঙ্গে আছে বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠান।
বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ বা এডিবির মতো প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের মতো দেশের সরকারের ‘ফ্রেন্ড, ফিলসফার অ্যান্ড গাইড’। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিতে দেশীয় সিন্ডিকেট ও চাঁদাবাজদের সঙ্গে সঙ্গে এদের ভূমিকাও কম নয়। ‘দাতা সংস্থা’ পরিচয় নিয়ে নির্ভরশীলতা ও চিন্তার আধিপত্য তৈরি করে নানা উন্নয়ন-কর্মসূচি বা সংস্কারের নামে এসব প্রতিষ্ঠান বস্তুত জনস্বার্থের বিনিময়ে মুনাফামুখী তৎপরতার পথ তৈরি করতেই নিয়োজিত থাকে। এভাবেই বিচার-বিবেচনা ছাড়া বেসরকারীকরণ, আমদানি বৃদ্ধি, প্রয়োজনীয় খাতে তহবিল কাটছাঁট, শিক্ষা-চিকিৎসা-পানির বাণিজ্যিকীকরণ, বাজারের স্বাধীনতার নামে কতিপয় গোষ্ঠীর একক কর্তৃত্ব, গ্যাস-তেল-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, কৃষি-উপকরণ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে বহুজাতিক কোম্পানির আধিপত্য, জাতীয় প্রতিষ্ঠান অকার্যকর করা, জাতীয় সক্ষমতার পথে বাধা সৃষ্টি ইত্যাদি ‘উন্নয়ন’ নীতি ও কর্মসূচির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে। গত তিন দশকে বিভিন্ন সরকারের গৃহীত এসব নীতি ও কর্মসূচিই দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, নাগরিকদের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বৈষম্য বৃদ্ধি এবং সব মিলিয়ে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রক্রিয়া জোরদার করেছে। জনস্বার্থবিরোধী ‘উন্নয়ন’-নীতি ও কতিপয় ব্যক্তির দুর্নীতির বলগাহীন তৎপরতায় পিষ্ট হচ্ছে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ।

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক হোক সমতাভিত্তিক

ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা ইতোমধ্যে তিনদিনের বাংলাদেশ সফর করে স্বদেশে ফিরে গেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগে তার এ সফর ছিল নানাদিক দিয়ে গুরুত্ববহ ও তাৎপর্যপূর্ণ।

গত বছর জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিলি্ল সফরকালে দ্বিপাক্ষিক সমস্যাগুলোর সমাধান এবং দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বৃদ্ধির যে অভিপ্রায় ঘোষিত হয়, প্রকাশিত হয় যে যৌথ ঘোষণা, এসএম কৃষ্ণার বাংলাদেশ সফরকালে সেই অভিপ্রায় ও ঘোষণা নিয়েই আলোচনা কেন্দ্রীভূত থেকেছে। আলোচনা হয়েছে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে, তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে, সীমান্তে বাংলাদেশি হত্যা নিয়ে, বাণিজ্য বৈষম্য নিয়ে, বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক সহযোগিতাসহ আরো নানা বিষয় নিয়ে।
দুটি প্রটোকলও স্বাক্ষরিত হয়েছে। দ্বিপক্ষীয় বিরোধগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তি এবং দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক ও সহযোগিতার ধারা আরো বেগবান ও ফলপ্রসূ করার অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে উভয় তরফে। পর্যবেক্ষকদের মতে, ঢাকা-দিলি্ল সম্পর্ক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশের পথ রচনায় এসএম কৃষ্ণার সফর এক মাইলফলক হিসেবে গণ্য হতে পারে। এসএম কৃষ্ণা ভারত ও বাংলাদেশকে একে অপরের প্রাকৃতিক বন্ধু হিসেবে উল্লেখ করে 'বিস'র সেমিনারে যে লিখিত বক্তব্য পেশ করেছেন, তা অনুপ্রেরণাদায়ক। তিনি বলেছেন, ভৌগোলিক অবস্থান দুদেশকে যে প্রাকৃতিক বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করেছে তা অটুট রাখতে হবে। দুই দেশের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের জন্য আমরা ঐতিহাসিক সুযোগকে কাজে লাগাতে ভুল করতে চাই না। অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে দুদেশের মধ্যকার সম্পর্ক এখন ভালো বলে মন্তব্য করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন এই বলে যে, বাংলাদেশ আর ভারতের মধ্যে এখন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়তে হবে যেন তা বিশ্বের কাছে রোল মডেল হিসেবে কাজ করে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিলি্ল সফরের পর বিভিন্ন পর্যায়ে সফর বিনিময় এবং সর্বশেষ এসএম কৃষ্ণার বাংলাদেশ সফর দুদেশের মধ্যে সুসম্পর্কোন্নয়ন ও সহযোগিতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে যে ঐকমত্য ও প্রত্যয় সৃষ্টি করেছে তা এগিয়ে নেয়া দুদেশের স্বার্থেই অপরিহার্য। বাংলাদেশ সব সময়ই ভারতের সঙ্গে সুসম্পর্ক চায়, পারস্পরিক স্বার্থেই সহযোগিতার সমপ্রসারণ চায়। দলের সঙ্গে দলের নয়, দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্কই আমাদের কাম্য। সম্পর্কের স্থায়িত্ব ও ধারাবাহিকতার স্বার্থেই এটা প্রয়োজন। একেক সময় একেক দল ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতার পরিবর্তন সম্পর্কের ওপর যাতে প্রভাব না ফেলে সেটা নিশ্চিত করা একটি বড় ব্যাপার। এজন্য যে কোনো সিদ্ধান্ত ও চুক্তির ক্ষেত্রে দুদেশের রাজনৈতিক ঐকমত্যের বিকল্প নেই। রাজনৈতিক ঐকমত্যভিত্তিক সম্পর্ক ও সহযোগিতা টেকসই সম্পর্ক ও সহযোগিতায় নিশ্চয়তা প্রদান করে। আমরা লক্ষ্য করেছি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিলি্ল সফরের সময় যেসব সমঝোতা বা চুক্তি হয়েছে তার বিষয়াদি প্রকাশ না করায় প্রশ্ন উঠেছে। চুক্তি না দেখে তার বিরোধিতা করা যেমন উচিত নয়, তেমনি চুক্তির বিষয় প্রকাশ না করাও ঠিক নয়। এতে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে বাধ্য। ভারতের সঙ্গে যে কোনো দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ক্ষেত্রে অবশ্যই আমাদের প্রাধান্য রাখতে হবে জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক প্রত্যাশার দিককে। দেশ কারো প্রাইভেট কোম্পানি নয়। আন্তঃরাষ্ট্রীয় চুক্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলীয় স্বার্থের কোনো স্থান নেই। জাতীয় স্বার্থই এখানে প্রধান ও চূড়ান্ত কাজেই আগামীতে ভারতের সঙ্গে যে চুক্তিই হোক না কেন, সে বিষয় পার্লামেন্টের মাধ্যমে জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে এবং আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। তাহলে কখনই এ চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠবে না।
ভারত বাংলাদেশের নিকট-প্রতিবেশী। ট্রানজিটের বিষয়ে সঙ্গত কারণেই দুটি দেশের পারস্পরিক আস্থার সম্পর্কটি অত্যন্ত জরুরি। রাজনৈতিক সদিচ্ছা ব্যতিরেকে ট্রানজিট সুবিধা দেয়া-নেয়া দুটি দেশের কারো পক্ষেই সম্ভব হবে না। এ জন্য ভারত-বাংলাদেশের অমীমাংসিত ইস্যুগুলোর একটি শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য সমাধান জরুরি। ইতোপূর্বে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরের সময়ে বেশকিছু বিষয়ে দুটি দেশের মধ্যে মতৈক্য হয়। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সে অনুযায়ী হয়েছে সেটি বলা যাবে না। এজন্য পরস্পরিক আস্থার অভাবকে দায়ী করা হয়। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফরের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। কারণ এ সফর দুটি দেশের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক নির্মাণে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে বলে বিশ্লেষক মহলের ধারণা।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা যেমনটি বলেছেন, 'ভারত শান্তিপ্রিয় দেশ। বাংলাদেশের সঙ্গে ট্রানজিটের ব্যবহার শান্তিপূর্ণ কাজেই করা হবে। ভারত চায় একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।' বাংলাদেশের সরকার ও এ দেশের জনসাধারণও ভারত সম্পর্কে একই মনোভাব পোষণ করে। কিন্তু এগুলো শুধু কথার কথা হিসেবেই থাকলে চলবে না। দুটি দেশের আচরণ ও কাজকর্মের মধ্যেও এর প্রতিফলন থাকতে হবে।
সীমান্তে হতাহতের সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসার আশ্বাস দিয়েছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশের মানুষ বাস্তবে এর প্রতিফলন দেখতে চায়। এছাড়া বাণিজ্য বৈষম্য কমানোর জন্য শুল্ক ও অন্যান্য বাধা দূর করার কথাও বলে আসছে বাংলাদেশ। ভারত সরকার এতে রাজি থাকলেও নানা জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। অশুল্ক বাধা দূর না হওয়ায় ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্য প্রবেশের সীমিত সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে বাংলাদেশ। এছাড়া বাণিজ্য বৈষম্যও কমছে না। দুটি দেশের মধ্যে বাণিজ্য ছাড়াও বিনিয়োগের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতীয় বিনিয়োগ হলে কর্মসংস্থান বাড়বে। এর ফলে দুটি দেশের জনসাধারণের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তি মজবুত হবে। যে কোনো সম্পর্কোন্নয়নের অন্যতম শর্ত হচ্ছে পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণার সমপ্রতি বাংলাদেশ সফরের মধ্য দিয়ে দুটি দেশের সম্পর্কোন্নয়নের ক্ষেত্রে এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। এসএম কৃষ্ণা ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, 'আমরা বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যেতে চাই, যা এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য অনুসরণীয় হতে পারে। দুটি দেশের মধ্যে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে ঘাটতি নেই। প্রতিটি ইস্যু নিয়ে আমরা এক সঙ্গে কাজ করে যাব।' ভারতের প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের আগে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর এ সফরটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরকালে দুটি দেশের মধ্যে যেসব বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে সেসব বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণা সুস্পষ্ট আভাস দিয়েছেন। বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশী ভারত। আমাদের গৌরবময় স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারত ছিল ঘনিষ্ঠ সহযোগী। ১৯৭১ সালে দুটি দেশের সম্মিলিত বাহিনীর কাছে হানাদার পাকিস্তানি আত্মসমর্পণ করে। দুটি দেশ একে অপরের পরীক্ষিত বন্ধু। বিশ্বায়নের এ যুগে দুটি দেশের মধ্যে নানা ক্ষেত্রে সম্পর্ক জোরদারের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাংলাদেশ ও ভারত একে অপরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি ও সৌহার্দের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে।
ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণার বক্তব্যের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি ভারতের আন্তরিক সদিচ্ছা প্রকাশিত হয়েছে। সদিচ্ছা থাকলে দুটি দেশের মধ্যকার যে কোনো মতবিরোধকে মতৈক্যে পেঁৗছা সম্ভব।
দুটি দেশের জনগণের যাতায়াত ব্যবস্থা আরো সহজ করা দরকার। এছাড়া সীমান্ত চিহ্নিতকরণ চুক্তির পাশাপাশি দুটি দেশের সীমান্তকে মৈত্রীর সীমান্তে পরিণত করতে হবে। দুপক্ষকেই সীমান্ত মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে কাজ করতে হবে। কারণ দুটি দেশই একে অপরের পরীক্ষিত বন্ধু। তাদের সম্পর্কের মধ্যে অস্বচ্ছতা ও বৈরিতা কাম্য নয়।
এ বছরের সেপ্টেম্বরে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশিত ঢাকা সফরের আগে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসএম কৃষ্ণার সফরটিকে বলা হচ্ছে অগ্রবর্তী ও প্রস্তুতিমূলক সফর। এসএম কৃষ্ণার সফরের পর দুদেশের কর্মকর্তারাই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন, কূটনৈতিক বিশ্লেষকরাও আশা প্রকাশ করেছেন যে মনমোহন সিংয়ের সফরটি 'ঐতিহাসিক' হবে। বলা আবশ্যক, এ বছরের জানুয়ারিতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরও 'ঐতিহাসিক' বলেই বিবেচিত হয়েছে। সে সময়ে দুদেশের প্রধানমন্ত্রীরা ৫০ দফা কর্মসূচি নির্ধারণ করেছিলেন। এ ৫০ দফা বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক নতুন দিগন্তে উপনীত হবে এমন আশাবাদ সত্ত্বেও নানা চুক্তির প্রস্তুতি ও বাস্তবায়নে ধীরগতি অনেক সময়ই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কৃষ্ণার সফরের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়েছে যে, ভারতে প্রধানমন্ত্রীর সফরের সময় দীর্ঘদিনের বিবদমান সমস্যার সমাধান হতে পারে। তিস্তা নদীর পানি বণ্টন বিষয়ে চুক্তি বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের দাবির একটি। এ ক্ষেত্রে ন্যায্য একটি চুক্তি হওয়া উচিত। কৃষ্ণা আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন যে, সেপ্টেম্বরেই তিস্তা ও ফেনী নদীর পানি বণ্টন ও সীমান্তবিরোধী নিষ্পত্তি বিষয়ে চুক্তি হতে পারে। অনিষ্পন্ন সীমানা, করিডোর ও ছিটমহল সমস্যা দীর্ঘদিন দরে দুদেশের অধিবাসীদের ভুগিয়ে চলেছে। এ বিষয়ে ১৯৭৪ সালে সম্পাদিত ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির আলোকে সমস্যাগুলোর সমাধান আসতে পারে।
পৃথিবীর নানা অঞ্চলে যখন বিবদমান দেশগুলো রাজনৈতিক বিরোধ ভুলে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার করছে, আঞ্চলিক জোটগুলো শক্তিশালী হয়ে উঠছে, তখন বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক কেন আরো উন্নত হবে না। পারস্পরিক স্বার্থ পূরণে প্রতিবেশী দেশ দুটির আরো ঘনিষ্ঠ হওয়া উচিত। এ ক্ষেত্রে সমতাভিত্তিক, সহিষ্ণু, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের খোলামেলা সম্পর্কই প্রত্যাশিত। দুদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে সে সম্পর্কই বাস্তবায়িত হবে বলে প্রত্যাশা করা যাচ্ছে।
তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো রাজনৈতিক সদিচ্ছার প্রকাশ। ভারতের পক্ষ থেকে যেসব বিষয়ে উদ্বেগ ছিল, বাংলাদেশ তার প্রায় পুরোটাই প্রশমিত করতে পেরেছে। এখন ভারতের পালা। সীমান্তে হতাহতের সংখ্যা শূন্যে নিয়ে আসার যে আশ্বাস ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়েছেন, তার দ্রুত বাস্তবায়নই দেখতে চায় বাংলাদেশের মানুষ।
বাণিজ্য-বৈষম্য কমাতে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার কথা বলে আসছে। ভারত রাজিও হয়েছে। কিন্তু নানা জটিলতায় তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। বিশেষ করে, অশুল্ক বাধার কারণে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের যে সীমিত সুযোগ আছে তা থেকেও আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। এ কথা ঠিক, কেবল বাণিজ্যে বিশেষ সুবিধা নিয়ে আমরা বেশিদূর এগোতে পারব না। সে জন্য দরকার বিনিয়োগ। বিনিয়োগ সুরক্ষা চুক্তি কার্যকর হলে বাংলাদেশই বেশি লাভবান হবে; কর্মসংস্থান বাড়বে।
দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হলে তাতে উভয় দেশই উপকৃত হবে। সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বিরোধপূর্ণ ও অমীমাংসিত বিষয়গুলোর দ্রুত সমাধান হওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশে ভারতের ট্রানজিট

বাংলাদেশে এখন ভারতের অন্যতম এজেন্ডা তাদের ট্রানজিট বিষয়টি নিশ্চিত করা। তাদের স্বার্থে ট্রানজিটের দাবি খুবই বোধগম্য। কারণ বাংলাদেশের তিন দিক দিয়েই ভারত, তার অনেকগুলো রাজ্য এমন দিকে, যেখানে যাওয়া তার জন্য খুবই ব্যয়বহুল ও কষ্টকর। সুতরাং তার জন্য খুব সুবিধাজনক হয়, যদি তারা বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পথ পায়। তার পণ্য পরিবহন, পুঁজি বিনিয়োগ, রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদির জন্য এই সহজ পথের অধিকার নিশ্চিত করা খুব দরকার। ভারতের এই প্রয়োজনীয়তা আমরা অনুভব করতে পারি। আমার খুব মনে আছে, বাংলাদেশের জন্য খুব কঠিন সময়, ২০০৭-৮ সালের কথা। চালের দাম বেড়ে যাচ্ছে, বিশ্বব্যাপীও চালের সঙ্কট, দাম বৃদ্ধি। চুক্তি অনুযায়ী ভারতের চাল বিক্রি করার কথা ছিল, কিন্তু হঠাত্ করেই তারা জানাল চাল বিক্রি করবে না, চালের দামও তারা বাড়িয়ে দিয়েছিল। সেসময় তত্কালীন ভারতীয় হাইকমিশনার সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, ‘আমাদের দেশের মানুষকে অনাহারে রেখে তো আপনাদের দেশে চাল বিক্রি করতে পারি না।’ তাহলে চুক্তির কী হল? ট্রানজিট নিয়ে আমরা এরকমভাবে কথা বলতে চাই না।

আমরা শুনতে চাই। ঠিক আছে, ভারতের জন্য ট্রানজিট প্রয়োজন। এতে কীভাবে আমরা সাহায্য করতে পারি, সেটি আমরা আলোচনা করতে পারি। কিন্তু ভারতের সঙ্গে আলোচনার সময় এটা খেয়াল রাখতে হবে, বাংলাদেশের সরকার বা প্রতিনিধিদলের দায়িত্ব এই দেশের জনগণের স্বার্থের বিষয়টি দেখা, ভারতের কাছে নতিস্বীকার নয়। বাংলাদেশের জন্য বিপর্যয় সৃষ্টি করে তো আমরা আর একটা দেশের সরকারের স্বার্থ দেখতে পারি না। যদিও কখনই আমরা ভারতীয় হাইকমিশনার সাহেবের মতো বলব না যে, তারা মারা যাক তাতে আমাদের কিছু আসে যায় না। সেক্ষেত্রে আমরা আলোচনায় বসতে পারি এই বিষয়ে যে, ওই অঞ্চলটাতে (যেখানে ভারতের কেন্দ্র থেকে যোগাযোগ খুব কষ্টসাধ্য) অর্থনীতির উন্নয়নের জন্য আমরা কী করতে পারি? তারা অবশ্য বলবে যে, ট্রানজিটটাই তাদের জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক। সেক্ষেত্রে বিবেচনা করতে হবে আমাদের দিক থেকে কী কী অসুবিধা হবে এবং কী কী লাভ হবে। যদি ক্ষতিকর হয় তাহলে বিকল্প কী?

এতদিন কেউ কেউ হিসাব দিচ্ছিলেন যে, ট্রানজিট থেকে আমাদের হাজার হাজার কোটি টাকা লাভ হবে। কিন্তু হাজার হাজার কোটি টাকার হিসাবটি কিসের ভিত্তিতে হয়েছে তা কারও জানা নেই। কারণ ট্রানজিটের টার্মস অ্যান্ড কন্ডিশন কী কী, কত ধরনের পণ্য আসবে এখানে, তার জন্য কতগুলো ট্রাক এদিক দিয়ে যাবে, রেললাইন তারা কতটা ব্যবহার করবে, জলপথ তো তাদের এমনিতেই ব্যবহূত হয় সেটি আরও কতগুণ বাড়বে, সেগুলোর পরিষ্কার কোনো চিত্র আমাদের কাছে নেই। সরকারের কাছে কোনো ডকুমেন্ট আছে কি না তা আমাদের জানা নেই। সরকারের কাছ থেকে কোনো তথ্য আমরা পাইনি। এই তথ্যগুলো ছাড়া কীভাবে কোন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা সরকারি লোকজন হিসাব করে বলতে পারে যে, এত হাজার কোটি টাকা লাভ হবে? সমীকরণের দুটো দিকই তো দেখতে হবে। সমীকরণের একদিক দেখলে কেউ বলতে পারেন যে, ট্রানজিটে রাজস্ব পাওয়া যাবে। সমীকরণের আরেক দিক, কিসের বিনিময়ে এই রাজস্ব পাওয়া যাবে, সেটাও হিসাবে না রাখলে অঙ্কটি সম্পূর্ণ হবে না।

আমাদের যে সড়ক ব্যবস্থা আছে, যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে, তা আমাদের পণ্য পরিবহনের জন্যও যথেষ্ট নয়। আমাদের নিজেদের জন্যই রাস্তা-ঘাট, অবকাঠামো অনেক সম্প্রসারণ করতে হবে। ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক তত্পরতা বাড়বে এবং যত বেশি যোগাযোগ ব্যবস্থা সম্প্রসারিত হবে এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়বে তত আমাদেরও যোগাযোগ চাহিদা অনেক বাড়বে। এরকম অবস্থায় আমাদের যা পরিবহন চাহিদা ঠিক তার সমান কিংবা বেশি পরিমাণ পণ্য পরিবহনের যদি দরকার হয় একটি বিদেশি রাষ্ট্রের, সেটিকে বাংলাদেশ কীভাবে ধারণ করবে, সেই বিষয়টি খুব গুরুত্বের সঙ্গে হিসাব করতে হবে। এখন যদি বলা হয় যে, ভারত ঋণ দেবে আমাদের এবং আমরা রাস্তা বানাব, সেটি তো কোনো যুক্তি হল না। ঋণ মানে তো আমাদেরই টাকা। আর তাদের জন্য রাস্তা বানাতে গিয়ে আমাদের কত আবাদি জমি যাবে, জলাভূমি যাবে সেটাও তো হিসাবে রাখতে হবে। কৃষিজমি নষ্ট হলে খাদ্য নিরাপত্তার ওপরও চাপ পড়বে। ভারত যে প্রয়োজনের সময় বাজার দামেও চাল বিক্রি করবে না সেটা তো আমরা অভিজ্ঞতা থেকেই দেখলাম। এখন জানা যাচ্ছে যে, যে রাজস্ব প্রাপ্তি ট্রানজিটের সুফল হিসেবে এতদিন বলা হচ্ছিল, সেটাও পাওয়া যাবে না। তাহলে?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, বাংলাদেশ এবং ভারতের যে বাণিজ্য এবং অন্যান্য সম্পর্ক, তার অবস্থা কী? বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য খুবই ভারসাম্যহীন। সেখানে আমদানি কয়েকগুণ বেশি রফতানির এবং আমদানি ফরমালি যা হয়, ইনফরমালি তার চেয়ে বেশি হয়। ভারতের ট্যারিফ ও ননট্যারিফ প্রতিবন্ধকতা অনেক বেশি। এই অবস্থায় বাণিজ্যের বিষয়টি ফয়সালা করতে গেলে কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা মাল্টিল্যাটারাল করা দরকার। দক্ষিণ এশিয়া, যেমন- মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, নেপাল, ভুটান, ভারত, আফগানিস্তান ধরে সমষ্টিগতভাবে এ কাজটি করা দরকার। কিন্তু আমরা সবসময় দেখি, এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য সত্য এবং ভারতের জন্যও সত্য যে, যারা শক্তিশালী রাষ্ট্র তারা সবসময়ই সবকিছু দ্বিপাক্ষিক করতে চায়। বহুপাক্ষিক করতে চায় না। কারণ বহুপাক্ষিক করলে যারা দুর্বল থাকে তারা একসঙ্গে কথা বলার সুযোগ পায়। আর দ্বিপাক্ষিক করলে বড় যে তার পুরো কর্তৃত্বের মধ্যে জিনিসটা থাকে।

নেপাল এবং বাংলাদেশ-এ দুটো দেশের বাণিজ্যের একটা ভালো সম্ভাবনা ছিল। নেপাল মংলা বন্দর ব্যবহার করতে চায়। এর জন্য নেপাল এবং বাংলাদেশের মাঝখানে যে ৩০-৩৫ কিমি রাস্তা আছে সেটি করিডোর হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছে ভারতের কাছে। ভারত তাতে বহুদিন আপত্তি করেছে। কয়েকদিন আগে এক বিশেষজ্ঞের কাছ থেকে জানলাম যে অনুমতি ভারত দিয়েছে, কিন্তু দেওয়ার ধরনটা এরকম যে, এতে কোনো কাজ হয়নি। কারণ রাস্তাটা খুব খারাপ। ভারত যদি রাস্তাটা ঠিক না করে, তাহলে তো নেপাল ঢুকতে পারবে না। এই কয়েক কিমি সড়ক পথ তৈরি করে দিতে ভারত যদি আপত্তি করে তাহলে বাংলাদেশ কী করে তার ট্রানজিট দিতে পারে? এটি একটি খুব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এ প্রশ্ন ফয়সালা না করে চট করে একটি সিদ্ধান্তে যাওয়া যায় না।

পূর্ব ভারতের সাত রাজ্যে ভারত যে পণ্যদ্রব্য নেওয়ার জন্য ট্রানজিট দাবি করছে, তার ব্যাপারে অন্যভাবেও সুরাহা হতে পারত। বাংলাদেশ সরকারই বলতে পারত, ওইসব রাজ্যে যে যে পণ্য সরবরাহ করা দরকার সেগুলো আমরাই করব। আমরা বিনিয়োগ করার ব্যবস্থা করি, আমরা ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি করি, আমরা হাসপাতালের ব্যবস্থা করি, আমরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করি-এগুলো করাতে কোনো অসুবিধা নেই। সেক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে একটি সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। বাংলাদেশই সেসব জায়গায় বিনিয়োগ করবে, ভারতের আর এত ঝামেলা করার দরকার নেই, ভারত শুধু বাংলাদেশকে বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারিত করে দিক, বাংলাদেশের পণ্যের ওপর নানা বাধা দূর করুক। এতে এসব অঞ্চলও উপকৃত হবে, বাংলাদেশও সীমান্তজুড়ে শিল্প এলাকা গড়ে তুলতে পারবে। মেরুদণ্ড থাকলে এভাবে আলোচনা অগ্রসর হওয়া খুবই সম্ভব।

সার্বভৌমত্ব একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিএনপি অনেক সময় সার্বভৌমত্বের কথা বলে। তাদের রাজনীতিতে আমরা ভারত বিরোধিতা দেখি, কিন্তু অর্থনীতির ক্ষেত্রে তারাও যেসব কর্মসূচি নিয়েছে তা ভারতের বৃহত্ পুঁজির স্বার্থই রক্ষা করেছে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, সাংস্কৃতিক সার্বভৌমত্ব যদি রক্ষা করতে হয় তাহলে ভারত, বহুজাতিক পুঁজি, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এডিবি, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে ঐক্যসূত্র আছে সেটিকে দেখতে হবে। একটি দেশের জন্য রাজস্ব কিংবা টাকা-পয়সা পাওয়াটাই বড় কথা নয়; নিজেদের জীবন, নীতিমালা, সম্পদের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব এবং নিয়ন্ত্রণ ও সার্বভৌম মর্যাদা মৌলিক বিষয়, যা নিয়ে কোনো ছাড় দেওয়া যায় না।

যদি বাংলাদেশের মানুষ দেখেন যে, ভারত একটি বৃহত্ রাষ্ট্র হওয়া সত্ত্বেও গণতান্ত্রিক আচরণ করছে এবং প্রতিবেশী হিসেবে সম্মানজনক আচরণ করছে তাহলে বাংলাদেশের মানুষও ছাড় দিতে রাজি থাকবে। ভারতের সঙ্গে আমাদের যে সমস্যাগুলো রয়েছে সেখানে ভারতের বিষয়টা তুললে এখানে বেশ জটিলতা হয়। ব্রিটিশরা চলে গেল, ভারত এবং পাকিস্তান হল, বাংলা দুই ভাগ হল, কাশ্মির দুই ভাগ হল, পাঞ্জাব দুই ভাগ হল, এর মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা হল, বর্ডারগুলো হল, তার মধ্য দিয়ে তৈরি হয়েছে অনেক জটিলতা। লাখো কোটি মানুষের যে দুর্দশা তার মধ্য দিয়ে হল, তার দায় বহন করতে হচ্ছে আজো। ফলে তার ধারাবাহিকতায় এখন পর্যন্ত ভারত সম্পর্কে যখন কোনো কথাবার্তা ওঠে তখন তা একটা সাম্প্রদায়িক চেহারা নেয়। কিন্তু এ বিষয়টি পরিষ্কার থাকা উচিত যে, ভারত এখানে যে বড় শক্তিসুলভ একটা আচরণ করছে কিংবা অনেকগুলো বিষয়ে তারা প্রতিবেশীসুলভ কোনো মর্যাদাই দিতে রাজি নয়; এসব আচরণের সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই।

ভারতে যদি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলমানও হতো তাহলেও এ রকম শাসনব্যবস্থায়, একই আচরণ করত। নেপাল একটি হিন্দু রাষ্ট্র। সেই নেপালে যারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদেরই এক নেতা আমাকে বলেছিলেন যে, ভারতের বিরুদ্ধে নেপাল এবং বাংলাদেশের একটি জোট হওয়া দরকার। ভারতের সঙ্গে দ্বন্দ্বটাই তাদের সবচেয়ে বেশি। এর সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতার কোনো সম্পর্ক নেই। দ্বিতীয়ত, ছিটমহলের জনগণের যে দুর্বিষহ অবস্থা সেটা নিয়ে কোনো সরকারেরই মনোযোগ নেই। মিডিয়াতেও সেভাবে আসে না। ছিটমহল খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তালপট্টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তালপট্টির ফয়সালা না হওয়ার ফলে আমরা সমুদ্রসীমা নিয়েও একটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে আছি। তালপট্টির বিষয়টি সুরাহা না হলে সমুদ্রসীমা নিয়েও আমরা বড় একটি বঞ্চনার শিকার হব। এখনও পর্যন্ত সমুদ্রসীমা ঠিক করা হয়নি। আগের সরকারগুলোও এটা নিয়ে কোনো কাজ করেনি। সমুদ্রসীমা ঠিক না করার ফলে ব্লকগুলো নিয়ে সমস্যা হচ্ছে। এসব বিষয় পরিষ্কার করতে হবে।

ফারাক্কার বিষয়টি বলা প্রয়োজন। ফারাক্কা এমন একটা ইস্যু যে ইস্যুর ফলে বাংলাদেশের যে কত ক্ষতি হয়েছে সেটি পরিমাপ করা মুশকিল। অবাধ পানিপ্রবাহ, তার সঙ্গে কৃষি সম্পর্ক, জীববৈচিত্র্যের সম্পর্ক, জনজীবনের সম্পর্ক-এসব বিষয় ফয়সালা করতে হবে। এরপর আবার আরেকটি ধ্বংসযজ্ঞের প্রস্তাব-টিপাইমুখ। সরকারের অবস্থান এক্ষেত্রেও খুবই দুর্বল। পরস্পর সফর বা আলোচনার সময় বাংলাদেশ দলের তো এসব বিষয় নিয়ে আলোচনায় জোর দেওয়ার কথা। এরপর আছে সীমান্তে হত্যাকাণ্ড। বাংলাদেশের নাগরিক শিশু-কিশোরী খুন হচ্ছে, অথচ সরকারের গলায় আওয়াজ নেই। যে দেশকে সন্ত্রাসী বিবেচনা করে ভারত কাঁটাতার দিয়ে ঘেরাও করে রাখে, সেই দেশের এক মাথা থেকে আরেক মাথা কী করে ভারত যাবে সেটাও তো এক বড় প্রশ্ন।